✍️ সহদেব মাহাত
ছোটনাগপুর মালভূমির সমাজ ও সংস্কৃতি মূলত কৃষিনির্ভর জীবনব্যবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত। এই অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক জীবন প্রধানত ধানচাষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়ায়, তাদের লোকসংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান ও পরব-উৎসব প্রকৃতি ও কৃষিচক্রের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। পরবগুলির মধ্য দিয়ে মানুষ প্রকৃতির শক্তিকে স্বীকার করে এবং তার সঙ্গে সহাবস্থানের সাংস্কৃতিক রীতি নির্মাণ করে। এই প্রেক্ষাপটে টুসু পরব এবং টুসু দেবীর ধারণা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
টুসু দেবী ছোটনাগপুর মালভূমির লোকসংস্কৃতিতে একটি স্বতন্ত্র লোকদেবী-ধারণা। তিনি কোনও শাস্ত্রীয় দেবী নন, আবার মন্দিরকেন্দ্রিক পূজার বিষয়ও নন। টুসু দেবী মূলত ফসলকেন্দ্রিক প্রতীক, যিনি উর্বরতা, কৃষিশ্রম ও জীবনের ধারাবাহিকতাকে প্রতিনিধিত্ব করেন। অগ্রহায়ন মাসের সংক্রান্তিতে টুসু দেবীর স্থাপনা করা হয়। এই স্থাপনার ক্ষেত্রে ডিনি মা আনার সময় সংগৃহীত ধানের শিষ ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, দেবীর প্রতিমা নির্মাণে কোনও মানবসৃষ্ট মূর্তি নয়, বরং কৃষকের উৎপাদিত ফসলই প্রধান উপাদান। এই প্রথা কৃষক সমাজের বস্তুবাদী ও প্রকৃতিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।
আঘন সংক্রান্তি থেকে পৌষ সংক্রান্তি পর্যন্ত প্রায় এক মাস ধরে টুসু পূজা পালিত হয়। এই পূজা কোনও পুরোহিতনির্ভর আচার নয়; বরং এটি সমবেত লোকাচারের রূপ, যেখানে গান, বিশ্বাস ও সামাজিক অংশগ্রহণ প্রধান ভূমিকা পালন করে। টুসু গান এই পরবের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক উপাদান। এই গানগুলির মাধ্যমে কৃষিজীবনের বাস্তবতা, নারীর অনুভব, প্রকৃতিচেতনা এবং লোকদর্শন প্রকাশ পায়।
টুসু গানের একটি বহুল প্রচলিত পঙ্ক্তি—
“জলে হেল জলে খেল,
জলে তোমার কে আছে,
মনেতে ভাবিয়ে দেখ,
জলে শ্বশুর ঘর আছে।”
এই গানে ‘জলে শ্বশুর ঘর’ কথাটি গভীর প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে। লোকদর্শনে জলকে সৃষ্টির আদি উৎস হিসেবে কল্পনা করা হয়। জীবন, ফসল ও প্রকৃতির পুনর্জন্ম জলের মাধ্যমেই সম্ভব—এই বিশ্বাস থেকেই টুসু দেবীর বিসর্জন জলে দেওয়া হয়। এখানে বিসর্জন মানে বিলোপ নয়, বরং সৃষ্টির মূল উৎসে প্রত্যাবর্তন এবং আগামী কৃষিচক্রের জন্য পুনর্নবীকরণের আহ্বান।
টুসু দেবীর বিসর্জন প্রথা ছোটনাগপুর মালভূমির মানুষের জীবনদর্শনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। এই অঞ্চলের লোকসংস্কৃতিতে জল, মাটি ও ফসল—এই তিনটি উপাদান জীবনের মূল আধার হিসেবে বিবেচিত। টুসু পরবের মধ্য দিয়ে মানুষ প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং একই সঙ্গে নিজের শ্রমের সামাজিক স্বীকৃতি প্রদান করে।
সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে টুসু দেবী ছোটনাগপুর মালভূমির মানুষের স্বাভিমান ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক। বহিরাগত ধর্মীয় কাঠামো বা শাস্ত্রীয় দেবতাতন্ত্রের বাইরে দাঁড়িয়ে এই লোকদেবী-ধারণা গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষ তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, পরম্পরা ও জীবনবোধকে সংরক্ষণ ও পুনর্নির্মাণ করে চলেছে।
অতএব, টুসু দেবী ও টুসু পরবকে কেবল একটি লোকউৎসব হিসেবে দেখলে তার তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি আসলে ছোটনাগপুর মালভূমির কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, প্রকৃতিনির্ভর জীবনদর্শন ও লোকসংস্কৃতির এক সামগ্রিক প্রতিফলন।
টুসু দেবী : ছোটনাগপুর মালভূমির কৃষিভিত্তিক লোকসংস্কৃতির এক প্রতীকী অধ্যয়ন
