লেখক: —সহদেব মাহাত
পুরুলিয়া তথা সমগ্র জঙ্গলমহল দীর্ঘদিন ধরেই এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি। সম্পদে ভরপুর হলেও উন্নয়নের স্রোত এখানকার মাটিতে পৌঁছায় না। সংস্কৃতি ও ইতিহাস সমৃদ্ধ হলেও প্রশাসনিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে এই অঞ্চল প্রায় অনুপস্থিত। এই প্রেক্ষাপটে কুড়মি সেনার পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের নিকট পেশ করা ২১ দফা দাবি নিছক সংগঠনের স্বার্থ নয়, বরং একটি এলাকার অস্তিত্ব, মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম।
এই দাবিগুলির মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি, জমি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পরিবেশ, কৃষি, স্বাস্থ্য—সবই অন্তর্ভুক্ত। নিচে প্রত্যেকটি দাবির তাৎপর্য ও গুরুত্ব নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হল।
১) CNT Act অনুযায়ী জমি সুরক্ষা
ছোটানাগপুর টেন্যান্সি (CNT) আইন ১৯০৮, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জমি রক্ষার জন্য প্রণীত। কিন্তু কুড়মিদের জমি রক্ষার কথা বলা থাকলেও বাস্তবে বহু জায়গায় এই আইনের তোয়াক্কা না করেই কুড়মি মাহাতোদের জমি জেনারেল ও অন্য সম্প্রদায়ের হাতে বিক্রি হচ্ছে। এটি কেবল আইন লঙ্ঘন নয়, বরং স্থানীয় মানুষের জীবনভিত্তি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর আঘাত।
গুরুত্ব: ভূমি হারালে মানুষ শুধু তার সম্পদ হারায় না, হারায় আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও অস্তিত্বের ভিত্তি। সরকারকে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
২) CRI সম্পর্কিত মন্তব্য দ্রুত প্রেরণ:-
কেন্দ্রীয় সরকার কুড়মি সম্প্রদায়ের আদিবাসী স্বীকৃতির প্রশ্নে রাজ্যের মতামত চেয়েছে। রাজ্যের দেরিতে প্রতিক্রিয়া এই সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নকে দীর্ঘায়িত করছে।
গুরুত্ব: এটি সামাজিক ও সাংবিধানিক সমতার প্রশ্ন। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ অপরিহার্য।
৩) স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি:-
জেলার যুবসমাজের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের অভাবে ভিনরাজ্যে শ্রমিক হিসেবে পাড়ি জমাচ্ছে। এতে পরিবার ও সমাজে ভাঙন দেখা দিচ্ছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪১ অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের দায়িত্ব স্থানীয় উন্নয়নমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা।
গুরুত্ব: কর্মসংস্থান মানে আত্মসম্মান ও সামাজিক স্থিতি। স্থানীয় উন্নয়নই স্থানীয় শান্তি ও অগ্রগতির মূল।
৪) অবৈধ ভূমি পড়চা বাতিল ও ভূমিহীনদের পাট্টা প্রদান:-
ভূমি জরিপে বহিরাগতদের নামে পড়চা প্রকাশ এক গভীর অন্যায়। এটি স্থানীয়দের অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।
গুরুত্ব: ন্যায়বিচার ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৈধ ভূমিহীনদের জমি পাট্টা প্রদান অপরিহার্য।
৫) সরকারি জমি ও বনভূমির বাণিজ্যিক হস্তান্তর বন্ধ:-
এলাকার সরকারি জমি এনজিও, শিল্পপতি বা ধর্মীয় সংগঠনের নামে হস্তান্তর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকারের পরিপন্থী।
গুরুত্ব: এটি Article 300A (Right to Property) ও “Public Trust Doctrine”-এর লঙ্ঘন। প্রাকৃতিক সম্পদ জনগণের, ব্যক্তির নয়।
৬) পাড়া ব্লকে সরকারি কলেজ স্থাপন:-
জঙ্গলমহলের ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার জন্য দূর জেলায় যেতে হয়, যা অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব অনেকের পক্ষে।
গুরুত্ব: স্থানীয় কলেজ মানে স্থানীয় শিক্ষার প্রসার, মেয়েদের শিক্ষার উন্নয়ন, ও সামাজিক অগ্রগতি।
৭) কুড়মালি ভাষায় শিক্ষা চালু:-
ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, সংস্কৃতির আত্মা। কুড়মালি ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু হলে শিশুরা নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবে।
গুরুত্ব: সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫০A অনুযায়ী মাতৃভাষায় শিক্ষা সাংবিধানিক অধিকার। এটি কুড়মি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটাবে।
৮) আবাসিক হোস্টেল স্থাপন:-
অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে বহু ছাত্রছাত্রী স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়।
গুরুত্ব: সরকারি আবাসিক হোস্টেল হলে শিক্ষার হার বাড়বে, শিক্ষার সুযোগ সমান হবে, বিশেষত পিছিয়ে পড়া সমাজের জন্য এটি আশীর্বাদ।
৯) প্রতিটি উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ বাধ্যতামূলক:-
বিজ্ঞান শিক্ষা আধুনিক উন্নয়নের মূলভিত্তি।
গুরুত্ব: এটি কেবল শিক্ষাগত উন্নয়ন নয়, ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির প্রস্তুতি।
১০) বনদপ্তরের বৃক্ষরোপণ স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা:-
প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ হয়, কিন্তু তার কোনো জবাবদিহি থাকে না। মৃত গাছের হিসাব ও রিপোর্ট প্রকাশ করলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা আসবে।
গুরুত্ব: পরিবেশ সংরক্ষণ Article 48A অনুসারে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এটি জঙ্গলমহলের আবহাওয়া ও প্রতিবেশ রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১১) স্থানীয় যুবকদের চাকরিতে অগ্রাধিকার:-
বহিরাগতদের প্রাধান্যে স্থানীয় বেকারত্ব বাড়ছে।
গুরুত্ব: Article 16 অনুযায়ী “Equality of Opportunity” নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। স্থানীয় মানুষ ছাড়া স্থানীয় উন্নয়ন অসম্ভব।
১২) কৃষকদের বীজ ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করা:-
বীজ ও সার সময়মতো না পেলে কৃষক ঋণে জর্জরিত হয়।
গুরুত্ব: কৃষি নির্ভর জেলাগুলিতে এটি অর্থনৈতিক স্থিতির মূলে। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচে।
১৩) নতুন চেক ড্যাম নির্মাণ ও পুরনো সংস্কার:-
বৃষ্টিনির্ভর কৃষি টিকিয়ে রাখতে জল সংরক্ষণ অপরিহার্য।
গুরুত্ব: Article 48A অনুযায়ী পরিবেশ রক্ষা ও কৃষির স্থায়িত্বের জন্য এটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।
১৪) পশুপালন খাতের উন্নয়ন:-
স্থানীয় অর্থনীতিতে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গুরুত্ব: এটি নারীস্বনির্ভরতা ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি শক্ত করবে।
১৫) প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার নিয়োগ:-
জঙ্গলমহলের গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
গুরুত্ব: স্বাস্থ্য Article 21 অনুসারে জীবনের অধিকার। সুস্থ সমাজ ছাড়া উন্নয়ন অসম্ভব।
১৬) কুড়মি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড পুনর্গঠন:-
বোর্ডের উদ্দেশ্য সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়ন, ব্যক্তিগত লাভ নয়।
গুরুত্ব: শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান যুবকদের অন্তর্ভুক্ত করলে বোর্ড বাস্তবসম্মত ও জনগণের সঙ্গে যুক্ত হবে।
১৭) “দাঁড়িপাল্লার ঝুমুর” সংশোধন:-
শিক্ষা ব্যবস্থায় কুড়মি সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয় বিকৃতভাবে উপস্থাপিত।
গুরুত্ব: পাঠ্যক্রমে সঠিক উপস্থাপন ঐতিহাসিক সম্মান রক্ষার প্রশ্ন, যা আত্মপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত।
১৮) করম, বাঁদনা, টুসু উৎসবের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা:-
মানভূমের এই উৎসবগুলি শুধুমাত্র আনন্দ নয়, একটি ঐতিহ্যের ধারক।
গুরুত্ব: সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করে।
১৯) পর্যটনে বরাদ্দ বৃদ্ধি:-
পুরুলিয়ার পাহাড়, ঝর্ণা, ও লোকসংস্কৃতি পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা বহন করে।
গুরুত্ব: এটি কর্মসংস্থান, রাজস্ব ও অঞ্চলের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
২০) কাঠ-বালি-পাথরের অবৈধ কারবার রোধ:-
অবৈধ খনন পরিবেশ ধ্বংস করছে, স্থানীয় সম্পদ বাইরের লোকের হাতে চলে যাচ্ছে।
গুরুত্ব: প্রশাসনিক কঠোরতা ছাড়া এই অর্থনৈতিক লুণ্ঠন বন্ধ হবে না। এটি প্রকৃতি ও মানুষের স্বার্থরক্ষার বিষয়।
২১) লায়া ভাতা চালু ও গরাম থান সংরক্ষণ:-
লায়া প্রথা মানভূমের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। এটি সামাজিক প্রশাসনের স্থানীয় কাঠামো।
গুরুত্ব: ঐতিহ্য রক্ষা মানে ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা। গরাম থান সরকারি স্বীকৃতি পেলে কুড়মি সমাজের সাংস্কৃতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।
🌿 সার্বিক মূল্যায়ন:
এই ২১ দফা দাবির মূলে রয়েছে তিনটি মূল দর্শন —
১️)অস্তিত্বের অধিকার (Right to Identity)
২️)অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন (Right-based Development)
৩️)সংস্কৃতিগত মর্যাদা (Cultural Dignity)
জঙ্গলমহলকে উন্নয়নের মূলস্রোতে আনতে হলে শুধু রাস্তাঘাট নয়, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান—সব দিকেই ভারসাম্যপূর্ণ নীতি দরকার। কুড়মি সেনার এই দাবি তাই কেবল একটি সমাজের নয়, বরং একটি সমগ্র অঞ্চলের “সময়ের দাবী”।
সরকার যদি এই দাবিগুলো গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করে, তাহলে পুরুলিয়া ও সমগ্র জঙ্গলমহল এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।
যেখানে থাকবে আত্মমর্যাদা, টেকসই উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক গৌরব এবং সামাজিক ন্যায়।

